রাতে পায়ে লাগালেই শরীরের বিষ বের হয়? ‘ডিটক্স ফুট প্যাড’ নিয়ে যা বলছে বিজ্ঞান
কুলাউড়া নিউজ ডেস্ক | স্বাস্থ্য সচেতনতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে নানা ধরনের স্বাস্থ্যপণ্য নিয়ে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে ‘ডিটক্স ফুট প্যাড’ বা ‘ডিটক্সিফাইং ফুট প্যাড’ অন্যতম। বিজ্ঞাপনে দাবি করা হচ্ছে, রাতে ঘুমানোর আগে পায়ের তলায় বিশেষ এই প্যাড লাগিয়ে রাখলে সকালে শরীর থেকে টক্সিন, ভারী ধাতু, রাসায়নিক ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ বের হয়ে যায়। কোনো কোনো বিজ্ঞাপনে আরও দাবি করা হচ্ছে, এটি ওজন কমাতে, ঘুম ভালো করতে, ক্লান্তি দূর করতে কিংবা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় উপকার করতে পারে।
কিন্তু এসব দাবির পেছনে কতটা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে? প্যাডটি সকালে খুলে কালো বা বাদামি হয়ে যাওয়ার অর্থই বা কী?
বিশেষজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্যের আলোকে বিষয়টি খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, ডিটক্স ফুট প্যাড শরীর থেকে টক্সিন বের করে—এমন দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের Mayo Clinic সরাসরি জানিয়েছে, ডিটক্স ফুট প্যাড কার্যকর—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কী এই ডিটক্স ফুট প্যাড?
ডিটক্স ফুট প্যাড সাধারণত ছোট আকারের একটি প্যাড, যা রাতে পায়ের তলায় লাগিয়ে রাখা হয়। বিভিন্ন ব্র্যান্ডে কাঠের ভিনেগার, উদ্ভিজ্জ উপাদান, খনিজ বা অন্যান্য উপাদান থাকার দাবি করা হয়। বিপণনকারীরা সাধারণত এটিকে শরীরের ‘প্রাকৃতিক ডিটক্সিফিকেশন’-এর একটি সহজ পদ্ধতি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
বিজ্ঞাপনের ভাষা সাধারণত বেশ আকর্ষণীয়—‘ঘুমানোর সময় শরীর পরিষ্কার’, ‘পায়ের মাধ্যমে টক্সিন বের’, ‘হেভি মেটাল অপসারণ’ কিংবা ‘সকালে দেখুন শরীর থেকে কী বের হয়েছে’—এ ধরনের দাবি ক্রেতাদের সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে।
সমস্যা হলো, কোনো পণ্য সম্পর্কে এমন দাবি করা আর সেই দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকা এক বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের National Center for Complementary and Integrative Health (NCCIH) ভোক্তাদের পরামর্শ দেয়, স্বাস্থ্যপণ্য সম্পর্কে বিজ্ঞাপন বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রমাণকে গুরুত্ব দিতে।
সকালে প্যাড কালো হয়ে যায় কেন?
ডিটক্স ফুট প্যাডের বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলোর একটি হলো—রাতে সাদা বা হালকা রঙের প্যাড পায়ে লাগানোর পর সকালে সেটি কালো, বাদামি বা আঠালো হয়ে যায়। বিজ্ঞাপনে অনেক সময় এটিকে শরীর থেকে ‘বিষ বের হওয়ার দৃশ্যমান প্রমাণ’ হিসেবে দেখানো হয়।
কিন্তু শুধু প্যাডের রং পরিবর্তন হওয়া দিয়ে শরীর থেকে টক্সিন বের হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না।
Mayo Clinic-এর তথ্য অনুযায়ী, ডিটক্স ফুট প্যাড প্রস্তুতকারকেরা প্যাডের রং পরিবর্তনকে শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের হওয়ার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তবে এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
অর্থাৎ, ‘প্যাড কালো হয়েছে = শরীরের বিষ বের হয়েছে’—এই সমীকরণ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
তাহলে টক্সিন বা ভারী ধাতু কি শরীর থেকে বের করা যায় না?
শরীরে ক্ষতিকর পদার্থ বা ভারী ধাতুর উপস্থিতি একটি বাস্তব স্বাস্থ্যগত বিষয় হতে পারে। কিন্তু সেগুলো শনাক্ত বা অপসারণের চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করে কোন পদার্থ শরীরে রয়েছে, কতটা রয়েছে এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর।
উদাহরণ হিসেবে NCCIH-এর তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘chelation therapy’ ব্যবহার করা হয়। এতে বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ শিরার মাধ্যমে দেওয়া হয়, যা কিছু ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেগুলো শরীর থেকে বের হতে সহায়তা করতে পারে। তবে এটিও নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিস্থিতির বিষয় এবং এর ঝুঁকিও রয়েছে।
এর সঙ্গে পায়ের তলায় একটি প্যাড লাগিয়ে রাখাকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
অতীতেও ‘ডিটক্স ফুট প্যাড’ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল
ডিটক্স ফুট প্যাডের অতিরঞ্জিত স্বাস্থ্যদাবি নতুন কোনো বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের Federal Trade Commission (FTC) অতীতে Kinoki নামে বাজারজাত করা ‘Detox Foot Pads’-এর বিপণনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল।
FTC-এর অভিযোগ অনুযায়ী, ওই পণ্যের বিপণনকারীরা দাবি করেছিলেন যে প্যাড পায়ের মাধ্যমে শরীর থেকে টক্সিন, ভারী ধাতু, রাসায়নিক ও বিপাকীয় বর্জ্য বের করতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ ও শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা এবং ওজন কমানোর দাবিও করা হয়েছিল।
২০০৯ সালে FTC এ ধরনের বিজ্ঞাপনকে deceptive advertising হিসেবে অভিযুক্ত করে। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে একটি ফেডারেল আদালত FTC-এর অনুরোধে ওই বিপণনকারীদের বিভিন্ন পণ্য প্রচার ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। FTC-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আদালতের আদেশে ১৪.৫ মিলিয়ন ডলারের একটি judgment-ও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যদিও তা আসামিদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে স্থগিত ছিল।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বর্তমানে বাজারে থাকা প্রতিটি ডিটক্স ফুট প্যাড একই কোম্পানি বা একই পণ্য নয়। তাই পুরোনো একটি মামলার ভিত্তিতে সব ব্র্যান্ডকে প্রতারণামূলক বলা যাবে না। তবে ঘটনাটি ভোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা—স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বড় দাবি করার আগে সেই দাবির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে কি না যাচাই করা জরুরি।
বিজ্ঞাপনে কোন বিষয়গুলো দেখলে সতর্ক হবেন?
অনলাইনে স্বাস্থ্যপণ্য কেনার সময় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল করা দরকার।
প্রথমত, কোনো পণ্য যদি একসঙ্গে অনেক রোগের সমাধানের দাবি করে, তাহলে সতর্ক হওয়া উচিত। যেমন—একই পণ্য ওজন কমাবে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করবে, উচ্চ রক্তচাপ কমাবে, ঘুম ভালো করবে, শরীরের বিষ বের করবে এবং জয়েন্টের ব্যথা দূর করবে—এ ধরনের বহুমুখী দাবি সাধারণত শক্ত প্রমাণের প্রয়োজন তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞাপনে ‘ডাক্তাররা অবাক’, ‘গোপন জাপানি প্রযুক্তি’, ‘১০০ শতাংশ প্রাকৃতিক’, ‘মাত্র এক রাতেই ফলাফল’ বা ‘বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত’—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হলেই সেটিকে বৈজ্ঞানিক সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।
NCCIH-এর পরামর্শ হলো, কোনো স্বাস্থ্যপণ্যের তথ্য যাচাই করার সময় দেখতে হবে—তথ্যটি কোথা থেকে এসেছে, কোনো গবেষণার ওপর ভিত্তি করে দাবি করা হচ্ছে কি না, গবেষণাটি কতটা নির্ভরযোগ্য এবং ওয়েবসাইটটি মূলত তথ্য দিচ্ছে নাকি পণ্য বিক্রি করছে।
প্যাড ব্যবহার করলে ক্ষতি হতে পারে?
ডিটক্স ফুট প্যাড শরীর থেকে বিষ বের করে—এমন প্রমাণ না থাকলেও প্রতিটি পণ্য যে সবার জন্য সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত, তা বলা যায় না।
প্যাডে থাকা কোনো উপাদানের কারণে কারও ত্বকে জ্বালা, অ্যালার্জি বা irritation হতে পারে। বিশেষ করে পায়ের ত্বকে ক্ষত, সংক্রমণ, র্যাশ বা অন্য কোনো সমস্যা থাকলে যেকোনো নতুন পণ্য ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো ব্যক্তি যদি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, লিভার বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হন, তাহলে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে কোনো ‘ডিটক্স’ পণ্যের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
‘ডিটক্স’ শব্দটি নিয়ে ভুল ধারণা
‘ডিটক্স’ শব্দটি শুনতে বৈজ্ঞানিক মনে হলেও বাজারে এটি অনেক সময় একটি marketing term হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শরীরের বর্জ্য ও বিভিন্ন বিপাকীয় পদার্থ অপসারণে আমাদের শরীরের নিজস্ব জৈবিক ব্যবস্থা রয়েছে। তাই কোনো পণ্য ব্যবহার করলেই শরীরের সব ‘বিষ’ বের হয়ে যাবে—এমন সরল ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
NCCIH বিভিন্ন ধরনের detox ও cleanse পদ্ধতি সম্পর্কে ভোক্তাদের সতর্ক করেছে এবং জানিয়েছে, এসব পদ্ধতি বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্নভাবে প্রচার করা হয়। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো পদ্ধতি ব্যবহারের আগে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার প্রমাণ বিবেচনা করা জরুরি।
ভোক্তাদের জন্য পরামর্শ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো স্বাস্থ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন দেখে আকৃষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে ‘প্রাকৃতিক’, ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন’, ‘রাতে ব্যবহার করুন’, ‘সকালে ফলাফল দেখুন’—এ ধরনের বার্তা মানুষের কৌতূহল বাড়ায়।
তবে স্বাস্থ্যপণ্য কেনার আগে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—পণ্যটির দাবির পক্ষে কি ভালো মানের মানবদেহভিত্তিক গবেষণা রয়েছে? গবেষণাটি কি স্বাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান করেছে? কোনো স্বীকৃত স্বাস্থ্য সংস্থা কি বিষয়টি সমর্থন করেছে? পণ্যটির উপাদানগুলো কী? এবং বিজ্ঞাপনটি কি মূলত বৈজ্ঞানিক তথ্য দিচ্ছে, নাকি শুধু পণ্য বিক্রির চেষ্টা করছে?
NCCIH বলছে, স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যের ক্ষেত্রে শক্তিশালী প্রমাণ সাধারণত একাধিক গবেষণা ও বিভিন্ন গবেষকের ফলাফল থেকে আসে; শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা বিজ্ঞাপনকে শক্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
শেষ কথা
ডিটক্স ফুট প্যাড শরীর থেকে টক্সিন, ভারী ধাতু বা অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ বের করে—এমন বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বর্তমানে নেই। তাই প্যাড সকালে কালো হয়ে যাওয়াকে শরীর থেকে বিষ বের হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
কেউ যদি শুধুমাত্র আরাম বা ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে এমন পণ্য ব্যবহার করতে চান, সেটি আলাদা বিষয়। কিন্তু বিজ্ঞাপনে করা ‘রোগ সারানো’, ‘ওজন কমানো’, ‘হেভি মেটাল বের করা’ কিংবা ‘শরীরের সব বিষ পরিষ্কার করার’ মতো দাবিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
স্বাস্থ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো—বিজ্ঞাপনের চমক নয়, বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে গুরুত্ব দেওয়া।
কুলাউড়া নিউজ-এর পাঠকদের প্রতি পরামর্শ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো স্বাস্থ্যপণ্য দেখে তাৎক্ষণিকভাবে কিনে বা ব্যবহার করার আগে পণ্যের দাবি যাচাই করুন। কোনো রোগের চিকিৎসা চললে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চলমান চিকিৎসা বন্ধ করে ‘ডিটক্স’ বা অন্য কোনো বিকল্প পদ্ধতির ওপর নির্ভর করবেন না।
